You are currently viewing হৃদরোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য
হৃদরোগ

হৃদরোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য

হৃদসংবহন তন্ত্র, মস্তিষ্ক, বৃক্ক ও প্রান্তিক ধমনী সম্পর্কিত রোগকে হৃদরোগ বলে।

হৃদরোগ সম্পর্কিত কিছু তথ্য:

  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চারজনে একজন হৃদরোগে মারা যায়।
  • বাংলাদেশে প্রতিবছর ২.৫ লক্ষ হৃদরোগে মারা যায়।
  • করোনারি হার্ট ডিজিজ, অ্যারিথমিয়া এবং মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন হৃদরোগের কয়েকটি উদাহরণ।
  • হৃদরোগ, ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা  করা যেতে পারে।
  • ধূমপান ত্যাগ এবং নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।

কারণসমূহ:

হার্ট এটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন জাতীয় হার্টের অসুখে করোনারি ধমনীতে ব্লক থাকার কারনে হৃৎপিন্ডে অক্সিজেন এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। যার ফলে হৃৎপিন্ডের কিছু কোষ বা অংশ মরে যায়। কিছু হৃদরোগ যেমন হাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি জিনগত অসুখ। জন্মগত হার্টের ত্রুটিগুলির পাশাপাশি মায়ের গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় শিশু এগুলো নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে।

হৃদরোগ আমাদের লাইফস্টাইলের উপর অনেকটা নির্ভর করে। কিছু কিছু জিনিস আমাদের হৃদরোগের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। যেমন-

  • উচ্চ রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরল
  • ধূমপান
  • অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলত্ব
  • ডায়াবেটিস
  • পারিবারিক ইতিহাস
  • জাঙ্ক ফুড খাওয়া
  • বয়স
  • অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন
  • মানসিক চাপ
  • অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

এগুলোর মধ্যে যে কোনও একটা কারণ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। বয়স বড় কারণগুলোর মধ্যে একটি। প্রজননে সক্ষম নারীর তুলনায় পুরুষদের হৃদরোগ হবার ঝুঁকি বেশি। মেনোপজের পরে নারী ও পুরুষের হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা সমান সমান। উদাহরণস্বরূপ, কোনও মহিলা ৫৫ বছর বয়সে পৌছে গেলে তার হৃদরোগের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

লক্ষণসমূহঃ

হৃদরোগের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং হৃদযন্ত্র ধড়ফড় করা। সাধারণত বুকের ব্যথা, এনজাইনা বা এনজাইনা পেক্টোরিস নামে পরিচিত এবং যখন হৃৎপিন্ডের কোনও অংশে পর্যাপ্ত পরিমানে অক্সিজেন প্রবেশ করতে পারেনা তখন এটা ঘটে থাকে। এনজাইনা সাধারণত শারীরিক পরিশ্রমের সময়ে হয় এবং সাধারণত ১০ মিনিটের মত স্থায়ী হয়।

রক্তের কোলেস্টেরল ধমনীর মধ্যে জমে এথেরোস্ক্লেরোসিস নামক কার্ডিওভাস্কুলার রোগ হতে পারে যার ফলাফলস্বরূপ হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলি এনজিনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এছাড়া এটা বিশ্রামে থাকার সময়ও দেখা দিতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলি অনেক সময় বদহজমের লক্ষণের মতো মনে হতে পারে। বুকজ্বালা এবং পেটের ব্যথা পাশাপাশি বুকে ভারী কিছু চেপে আছে এমন অনুভূতি হতে পারে।

হৃদরোগের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং হৃদযন্ত্র ধড়ফড় করা। সাধারণত বুকের ব্যথা, এনজাইনা বা এনজাইনা পেক্টোরিস নামে পরিচিত
বুকে ব্যথা

হার্ট অ্যাটাকের অন্যান্য লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে :

  • ব্যথা যা বুকের বাম দিক থেকে শুরু হয়ে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে যায়, যেমন – বাম হাত,আংগুল, ঘাড়, পিঠ, পেটে বা চোয়াল পর্যন্ত।
  • হালকা মাথা ঘোরা
  • প্রচুর ঘাম
  • বমি বমি ভাব এবং বমি

হার্ট ফেইলুর হৃদরোগের আরেকটি পরবর্তী অবস্থা। যখন হৃৎপিন্ড ঠিকমত পাম্প করতে পারেনা তখন রক্ত সঞ্চালন বিঘ্নিত হয়। এমতবস্থায় ফুসফুসে পানি জমে রোগির শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

হৃৎপিন্ডের কিছু সমস্যা কোনও লক্ষণ ছাড়াও দেখা যেতে পারে, বিশেষত বয়স্ক এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে।

হৃৎপিন্ডের জন্মগত সমস্যা থাকলে যে লক্ষণগুলো দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে:

  • ঘাম ঝরা
  • প্রচন্ড ক্লান্তি
  • দ্রুত হার্টবিট এবং শ্বাস নেওয়া
  • বুক ব্যথা
  • ত্বক নীল বর্ণ ধারণ করা
  • ক্লাবযুক্ত নখ

গুরুতর ক্ষেত্রে, লক্ষণগুলি জন্ম থেকেই দেখা দিতে পারে। তবে সাধারণত ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত এই লক্ষণগুলো বিকশিত হয় না।

প্রকারভেদ:

হৃদরোগের অনেক প্রকারভেদ রয়েছে যা হৃৎপিন্ডের বিভিন্ন অংশকে আক্রান্ত করে এবং বিভিন্নভাবে ঘটে।

  • জন্মগত হৃদরোগ
  • অ্যারিথমিয়া
  • করোনারি আর্টারি ডিজিজ
  • ডায়ালেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি
  • মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন
  • হার্ট ফেইলিওর
  • হাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি
  • মাইট্রাল স্টেনোসিস
  • মাইট্রাল ভালভ প্রল্যাপস
  • পালমোনারি স্টেনোসিস
  • হার্ট ইনফেকশন

চিকিৎসা:

দুই উপায়ে হৃদরোগের চিকিৎসা করা যায়। প্রাথমিকভাবে, হৃদরোগের কিছু ওষুধ ব্যবহার করে হৃদরোগের চিকিৎসা  করা যায়। যদি ওষুধ ব্যবহার করে কাজ না হয় তবে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অস্ত্রোপচার করা হয়ে থাকে।

ওষুধপ্রয়োগ:

হৃদরোগের জন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন করা এবং চিকিৎসকের অধীনে থেকে নিয়মিত ফলোআপে থাকা বাধ্যতামূলক। চিকিৎসক কিছু কিছু ওষুধ দিয়ে থাকেন যেগুলো হৃদরোগের ধরণ অনুযায়ী নিয়মিত সেবন করার পরামর্শ দেয়া হয়।

এরকম কিছু ওষুধ হল:

  • স্ট্যাটিনস গ্রুপের ওষুধ যা রক্তের কোলেস্টেরল হ্রাস করে
  • এন্টিপ্লেটলেট জাতীয় ওষুধ যা রক্ত জমাট বাঁধা রোধের জন্য বা রক্ত পাতলা করার জন্য দেয়া হয়
  • হার্ট অ্যাটাক/ হার্ট ফেইলুর রোধ করার জন্য, হৃদযন্ত্র ভালো রাখার জন্য এবং উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার জন্য এন্টিহাইপারটেন্সিভ গ্রুপের ওষুধ

ওষুধগুলো আপনাদের জানানোর উদ্দ্যেশে দেয়া হয়েছে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধগুলো ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

হৃদরোগের জন্য হার্ট সার্জারি একটি বিকল্প চিকিৎসা। হার্ট সার্জারি মাধ্যমে হৃৎপিন্ডকে পুনরায় কর্মক্ষম করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
সার্জারি

সার্জারি:

হৃদরোগের জন্য হার্ট সার্জারি একটি বিকল্প চিকিৎসা। হার্ট সার্জারি মাধ্যমে হৃৎপিন্ডকে পুনরায় কর্মক্ষম করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।

হৃদরোগের শেষ পর্যায় যেমন- হার্টের ব্লক এবং হার্টের অন্যান্য গুরুতর সমস্যা সমাধানে যেখানে শুধুমাত্র ওষুধ যথেষ্ট নয় সেখানে সার্জারি একটি কার্যকরী পদক্ষেপ হতে পারে।

সবচেয়ে সাধারণ সার্জারিগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, যেখানে একটি বেলুন ক্যাথেটার সংকীর্ণ রক্তনালীগুলি প্রশস্ত করতে প্রবেশ করানো হয় যা রক্তের প্রবাহকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে
  • করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারি, যা রক্তের প্রবাহকে ব্লক হয়ে যাওয়া ধমনীগুলোর মধ্য দিয়ে হৃৎপিন্ডে পৌঁছাতে সাহায্য করে
  • ত্রুটিযুক্ত হার্টের ভালভগুলো মেরামত বা প্রতিস্থাপনের জন্য সার্জারি
  • পেসমেকার অথবা ইলেকট্রনিক মেশিন যা অ্যারিথমিয়ার রোগীদের জন্য হার্টবিট নিয়ন্ত্রণ করে
  • হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট আরেকটি বিকল্প সার্জারি । তবে প্রয়োজনীয় সময়ে সঠিক আকার এবং রোগির রক্তের গ্রুপের সাথে মেলে এরকম উপযুক্ত হৃৎপিন্ড  খুঁজে পাওয়া প্রায়ই কঠিন হয়ে পরে। দেখা যায় দাতার  হৃৎপিন্ডের জন্য কখনও কখনও বছরের পর বছর ও অপেক্ষা করতে হয়।

প্রতিরোধ:

জন্মগত হৃদরোগ প্রতিরোধ করা যায় না।তবে অন্যান্য ধরণের হৃদরোগ নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করে কিছুটা  প্রতিরোধ করা যেতে পারে। যেমন –

  • সুষম খাদ্য খাওয়া যেমন – কম চর্বিযুক্ত, উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার এবং প্রতিদিন পাঁচ ভাগে তাজা ফল এবং শাকসব্জী খাওয়ার চেষ্টা করুন। শাকসবজি গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি করুন এবং ডায়েটে লবণ এবং চিনির পরিমাণ হ্রাস করুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন। এটি হার্ট এবং রক্ত সংবহনতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, কোলেস্টেরল হ্রাস করবে এবং সঠিক রক্তচাপ বজায় রাখবে।
  • আপনার উচ্চতা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর দেহের ওজন বজায় রাখুন। আপনার বর্তমান এবং বডি মাস ইনডেক্স (BMI) অথবা BMI কত হওয়া উচিত তা জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • আপনি যদি ধূমপায়ী হয়ে থাকেন তবে তা অবিলম্বে ত্যাগ করুন। হৃদপিণ্ড এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগগুলোর জন্য ধূমপান একটি প্রধান ঝুঁকির কারণ।
  • অ্যালকোহল খাওয়া বন্ধ করে দিন।
  • উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো জটিলতা হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে তাই নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকের ফলোআপে থেকে এই রোগগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

যদিও উপরোল্লিখিত পদক্ষেপগুলি হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পূর্ণরূপে কমাতে পারবে না, তবুও এগুলো মেনে চললে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে এবং হার্টের জটিলতার সম্ভাবনাগুলোকে হ্রাস করে আপনাকে একটি সুস্থ স্বাভাবিক জীবন গঠন করতে সাহায্য করতে পারে।

Leave a Reply