You are currently viewing বাবা-মায়ের রক্তের গ্রুপ এবং সন্তানের উপর এর প্রভাব
স্বামীর রক্তের গ্রুপ পজিটিভ এবং স্ত্রীর নেগেটিভ হলে আসলেই কী সমস্যা হতে পারে?

বাবা-মায়ের রক্তের গ্রুপ এবং সন্তানের উপর এর প্রভাব

সন্তান বাবা মায়ের জীবনের এক শ্রেষ্ঠ উপহার। একথা সবারই জানা যে সন্তানের শারীরিক, মানসিক গড়ন, বৈশিষ্ট্য অনেকটাই নির্ধারিত হয় বাবা মায়ের থেকে পাওয়া জিনের সূত্রে। বিভিন্ন জেনেটিক রোগ এবং স্বাস্থ্য সমস্যাও একইভাবে সন্তানের দেহে পরিবাহিত হতে পারে। তেমনিভাবে রক্তের গ্রুপও এরকম একটি বৈশিষ্ট্য যার উপাদান বাবা মায়ের কাছে থেকে আসে। অনেক দম্পতিই চিকিৎসকের কাছে এসে জানতে চান যে স্বামী -স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ এক হলে কোন সমস্যা হয় কীনা। অথবা স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ একই হলে বাচ্চার জন্মগত সমস্যা হয় কীনা। আসলে স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ এক হলে কোনো সমস্যা হয় না। এটাও সত্যি নয় যে সন্তানের রক্তের গ্রুপ বাবা অথবা মায়ের সাথে পুরোপুরি মিলতেই হবে অথবা মিলে গেলে বাচ্চার কোন সমস্যা হবে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে বুঝতে হলে রক্তের গ্রুপ বিষয়ে একটু বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।

কীভাবে রক্তের গ্রুপ নির্ধারিত হয়?

প্রথমেই রক্তের গ্রুপগুলো সম্পর্কে জেনে নেই। রক্তের গ্রুপ প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত। এরা হলো –

         ১. এবিও পদ্ধতি (এ, বি, এবি এবং ও)

         ২. আরএইচ ফ্যাক্টর (আরএইচ পজেটিভ এবং আরএইচ নেগেটিভ)। এ রেসাস ফ্যাক্টরই ঠিক করে দেয় ব্লাড গ্রুপ পজেটিভ হবে না নেগেটিভ হবে। 

  • এবিও পদ্ধতি (, বি, এবি এবং ): আমাদের রক্তকণিকার গায়ে কিছু বিশেষ প্রোটিন বা এন্টিজেন থাকে যার উপর নির্ভর করে আমাদের রক্তের গ্রুপ কি হবে। এগুলো প্রধানত চার ধরণের – এ, বি, এবি এবং ও। যদি রক্তকণিকার গায়ে ‘এ’ এন্টিজেন থাকে, তবে রক্তের গ্রুপ ‘এ’। যদি রক্তকণিকার গায়ে ‘বি’ এন্টিজেন থাকে, তবে রক্তের গ্রুপ ‘বি’। যদি ‘এ’, ‘বি’ দু’টো প্রোটিনই থাকে তবে সেই ব্যক্তির রক্তের গ্রুপ ‘এবি’। আর যদি এ’, ‘বি’ কোন প্রোটিনই না থাকে তবে সেই ব্যক্তির রক্তের গ্রুপ ‘ও’।
  • আরএইচপদ্ধতি: ‘আরএইচ’ পদ্ধতি হলো রক্ত বিভাজনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এই বিভাজন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কার্লল্যান্ড স্টেইনার ও আলেক জেন্ডার উইনার ‘রেসাস মানকি’ (বানর) ব্যবহার করেছিলেন বলে এর নাম ‘আরএইচ’ পদ্ধতি। কারও রক্তের লোহিত কণিকার গায়ে ‘আরএইচ ফ্যাক্টর/ডি’ এন্টিজেন থাকলে ‘আরএইচ পজেটিভ’ এবং না থাকলে ‘আরএইচ নেগেটিভ’। অর্থাৎ ‘এবিও’ পদ্ধতির মাধ্যমে কারও রক্তের গ্রুপ ‘বি’ হলে এবং তার রক্তে ‘আরএইচ ফ্যাক্টর/ডি’ এন্টিজেন পাওয়া না গেলে, তার রক্তের গ্রুপ হলো ‘বি নেগেটিভ’ আর যদি ‘ডি এন্টিজেন’ পাওয়া যায় তাহলে তা হবে ‘বি পজেটিভ’। এভাবে ‘এবিও’ এবং ‘আরএইচ’ পদ্ধতি ব্যবহার করে ‘এ পজেটিভ/নেগেটিভ’,‘বি পজেটিভ/নেগেটিভ’, ও ‘পজেটিভ/নেগেটিভ’ এবং ‘এবি পজেটিভ/নেগেটিভ’ রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ করা হয়। প্রসঙ্গত, ‘আরএইচ পজেটিভ’ ধারীরা ‘আরএইচ পজেটিভ’ ধারীর এবং ‘আরএইচ নেগেটিভ’ ধারীরা ‘আরএইচ নেগেটিভ’ ধারীর সাথে রক্ত বিনিময় করতে পারবেন, যদি তারা ‘এবিও’ পদ্ধতির শর্তের মধ্যে থাকেন।

নিজের রক্তের গ্রুপ জেনে রাখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বিভিন্ন গ্রুপের বৈশিষ্ট্যগুলো জানাও জরুরী। যেমন ‘এবি’ রক্তের গ্রুপকে বলা হয় সর্বজনীন গ্রহীতা, অর্থাৎ এই গ্রুপের লোকজন কোন সমস্যা ছাড়াই যে কোন গ্রুপের রক্ত গ্রহণ করতে পারে। আবার ‘ও’ গ্রুপ হল সর্বজনীন দাতা, তারা যে কোন গ্রুপের ব্যক্তিকে রক্ত দিতে সক্ষম।

স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ এক হলে কোনও সমস্যা হয় কি?

অনেকেই ভাবেন স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ এক হলে সন্তান সুস্থ হয়ে জন্মগ্রহণ করে না ৷ কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এতে কোনও সমস্যাই হয় না। এশিয়াতে প্রায় ৪৬ ভাগ মানুষের রক্তের গ্রুপ ‘বি’। এশিয়ায় নেগেটিভ রক্তের গ্রুপ ৫ শতাংশ, সেখানে ইউরোপ আমেরিকাতে প্রায় ১৫ শতাংশ। যেখানে উপমহাদেশে সিংহভাগ মানুষের রক্তের গ্রুপ ‘বি’। সেখানে স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপের মিল হবে সেটাই স্বাভাবিক।

বাচ্চার সমস্যা কখন হয় ?

স্বামীর রক্তের গ্রুপ যদি পজেটিভ হয় তাহলে স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ পজিটিভ হতে হবে । তবে স্বামীর গ্রুপ যদি পজিটিভ হয় তাহলে কোনোভাবেই স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হওয়া চলবে না । আর যদি স্বামীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হয় তাহলে স্ত্রীর পজিটিভ বা নেগেটিভ যেকোনো একটি হলেই হবে।  এক্ষেত্রে স্ত্রীর গ্রুপ যদি নেগেটিভ হয় তাহলে তার স্বামীর রক্তের গ্রুপও নেগেটিভ হলে অনেক সমস্যা এড়ানো যাবে। 

স্বামীর রক্তের গ্রুপস্ত্রীর রক্তের গ্রুপসন্তানের অবস্থা
পজিটিভ(+)পজিটিভ(+)সুস্থ সন্তান
নেগেটিভ(-)নেগেটিভ(-)সুস্থ সন্তান
নেগেটিভ(-)পজিটিভ(+)সুস্থ সন্তান
পজিটিভ(+)নেগেটিভ(-)প্রথম সন্তান সুস্থ, দ্বিতীয়টি থেকে সমস্যা

স্বামীর রক্তের গ্রুপ পজিটিভ এবং স্ত্রীর নেগেটিভ হলে আসলেই কী সমস্যা হতে পারে?

স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ মিলে গেলে কোনো সমস্যা হয় না । তবে স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ যদি নেগেটিভ হয় আর স্বামী যদি পজিটিভ হয় তাহলে ‘লিথাল জিন´ বা ‘মারন জিন´ নামে একটি জিন তৈরি হয় যা পরবর্তীতে জাইগোট তৈরিতে বাঁধা দেয় বা জাইগোটকে মেরে ফেলে । সেক্ষেত্রে মৃত বাচ্চার জন্ম হতে পারে । বাচ্চা হতে পারে বর্ণান্ধ । এছাড়া যখন কোনো নেগেটিভ গ্রুপের মা পজিটিভ রক্তের ফিটাস (ভ্রূণ) ধারণ করে তখন সাধারণত প্রথম বাচ্চার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্ত ডেলিভারির সময় পজিটিভ ভ্রূণের রক্ত, প্লাসেন্টার ( গর্ভফুল ) পর্দা ভেদ করে মায়ের শরীরে প্রবেশ করে। মায়ের শরীরেও প্রসবের সময় যে রক্ত প্রবেশ করে, তা প্রসবের কয়েক মাসের মধ্যেই মায়ের শরীরে আরএইচ এন্টিবডি তৈরি করে। যখন মা দ্বিতীয়বার সন্তান বহন করবেন তখন যদি তার ভ্রূণের ব্লাডগ্রুপ পুনরায় পজিটিভ হয়, তাহলে মায়ের শরীরে আগে যে এন্টিবডি তৈরি হয়েছিল সেটা প্লাসেন্টার পর্দা ভেদ করে বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করবে। আর যখন এটা ভ্রূণের শরীরে ঢুকবে তখন ভ্রূণের লোহিত রক্তকণিকার কোষগুলো ভেঙ্গে যাবে। এ সমস্যাকে চিকিৎসাবিদ্যার ভাষায় বলা হয় আরএইচ ইনকমপ্যাটিবিলিটি। দ্বিতীয় সন্তান থেকে শুরু করে পরবর্তী সব পজিটিভ রক্তের গ্রুপ বহনকারী সন্তানের ক্ষেত্রে এই সমস্যার তীব্রতা কেবল বাড়তেই থাকবে।

শিশুর কি কি সমস্যা হবে?

জন্মের পরপরই শিশু দ্রুত হয়ে পড়বে রক্তশূন্য, দেখা দিবে তীব্র জন্ডিস। রক্তস্বল্পতার জন্য শিশু ফ্যাকাশে আর ভীষণ দুর্বলতা নিয়ে জন্মাবে, খাবেনা বা খেতে পারবে না, এমনকি স্বাভাবিক নড়াচড়া করতেও সক্ষম হবে না। তীব্র রক্তশূন্যতা থেকে হৃদযন্ত্রের কর্যক্রম বিপন্ন হতে পারে, চিকিৎসাবিদ্যার ভাষায় যাকে বলা হয়, ‘হার্ট ফেইলিউর’। জন্মের আগেই হার্ট ফেইলিউর হয়ে গেলে মর্মান্তিক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সেই শিশু এমনকি প্রাণহীন অবস্থায়ও জন্ম নিতে পারে। জন্ডিসের মাত্রা বেশি হলে, রক্তের বর্ধিত বিলিরুবিন এক পর্যায়ে অপরিণত মস্তিষ্কে ঢুকে পড়তে পারে। এটা তার মস্তিষ্ক নস্ট করে দিয়ে জীবন শুরু হওয়ার আগেই মহা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। শিশু হতে পারে মানসিক, শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী।

এটি নির্ণয় করার কোন পদ্ধতি আছে কি ?

আরএইচ নেগেটিভ মা তাঁর আরএইচ/ডি-অ্যান্টিজেনের প্রতি কতটা সংবেদনশীল হয়েছেন, তার মাত্রা মায়ের গর্ভকালীন সিরাম ইনভাইরেক্ট কুম্বসটেস্ট দ্বারা নির্ণয় করা যায়। প্রতিক্রিয়ার মাত্রা যত বেশি হবে, গর্ভস্থ ভ্রূণ ক্ষতির শিকার হবে তত বেশি।

চিকিৎসা?

এর চিকিৎসা নির্ভর করবে শিশুর রোগের তীব্রতা কতটুকু, কত তাড়াতাড়ি রোগ নির্ণয় হল তার উপর। শিশুর অবস্থার উপর নির্ভর করে প্রধানত তিনটি পদ্ধতির এক বা একাধিক চিকিৎসা প্রয়োজন হবে। এগুলো হলো-

  • ফটোথেরাপি
  • শিশুর শরীরে রক্ত পরিসঞ্চালন
  • কোন কোন ক্ষেত্রে শিশুর প্রায় সমস্ত রক্ত পরিবর্তন করে দিতে হয়, যাকে বলে, ‘এক্সচেঞ্জ ট্রান্সফিউশন।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের যথাযথ প্রয়োগ করে আজকাল এমন শিশুদের বেশীর ভাগকেই সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স সহ উপযুক্ত জনবল এবং সরঞ্জামাদি। তবে অন্য যে কোনো অসুস্থতার মতই এ ক্ষেত্রেও প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। কথাটি এ বিশেষ পরিস্থিতিতে যেন একটু বেশি সত্য।

প্রতিরোধ কি ভাবে করতে হবে?

স্বামী স্ত্রী যদি যথাক্রমে পজিটিভ ও নেগাটিভ গ্রুপের হয়ে থাকেন তবে গর্ভের শুরু থেকে ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। চিকিৎসক গর্ভ চলাকালিন বেশ কয়েক বার মায়ের রক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা করে শিশুর অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করতে পারবেন। আশঙ্কাজনক কিছু ধরা পড়লে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিবেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সন্তান প্রসবের পর প্রথম কাজ হবে, অতি দ্রুত শিশুর রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা। যদি শিশু নেগেটিভ হয় তাহলে কিছুই করতে হবে না, আর দশটি স্বাভাবিক শিশুর জন্য যা এখানেও কেবল তাই। যদি শিশুর রক্তের গ্রুপ হয় পজিটিভ তখন মাকে সন্তান প্রসবের ৭২ ঘন্টার মধ্যে একটি ইনজেকশন দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ইনজেকশন টি একটু দামি বটে, তবে নাগালের বাইরে নয়। তার চেয়ে বড় কথা এটি সব জায়গায় সহজপ্রাপ্য নয়। তাই এমন অবস্থায় এটির জন্য আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। মায়ের এই ইনজেকশন নেয়া অতীব গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে রোগটি প্রতিরোধের জন্য, বর্তমান শিশুর জন্য নয়।

এভাবেই একটু সচেতন, একটু সতর্ক হলেই একটা সন্তান বাঁচবে, বাঁচবে একটা পরিবার, আমাদের প্রিয় পৃথিবীটা হবে আরও সুন্দর। আসুন সুকান্তের ভাষায় বলি, ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’।

Leave a Reply