You are currently viewing ফ্রি রেডিক্যালজনিত শারীরিক ক্ষতি ও এর সমাধান
এই পৃথিবীতে আমরা কেউই বুড়ো হতে চাইনা। সবাই চিরজীবন যৌবনকে ধরে রাখতে চাই। কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বার্ধক্য আসে। আমাদের মধ্যে অনেককেই দেখা যায় যারা অল্প বয়সেই বুড়িয়ে গেছেন অথবা নানা রকমের রোগ-ব্যাধির কাছে অল্প বয়সেই কুপোকাত হয়ে আছেন। যখন অসময়ে আমাদের জীবনে বার্ধক্য আসতে থাকে, তাকে আমরা বলে থাকি অকাল বার্ধক্য। আর এ অকাল বার্ধক্যের জন্য দায়ী হল এক নিরব ঘাতক। যার নাম ফ্রি রেডিক্যাল।

ফ্রি রেডিক্যালজনিত শারীরিক ক্ষতি ও এর সমাধান

এই পৃথিবীতে আমরা কেউই বুড়ো হতে চাইনা। সবাই চিরজীবন যৌবনকে ধরে রাখতে চাই। কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বার্ধক্য আসে। আমাদের মধ্যে অনেককেই দেখা যায় যারা অল্প বয়সেই বুড়িয়ে গেছেন অথবা নানা রকমের রোগ-ব্যাধির কাছে অল্প বয়সেই কুপোকাত হয়ে আছেন। যখন অসময়ে আমাদের জীবনে বার্ধক্য আসতে থাকে, তাকে আমরা বলে থাকি অকাল বার্ধক্য। আর এ অকাল বার্ধক্যের জন্য দায়ী হল এক নিরব ঘাতক। যার নাম ফ্রি রেডিক্যাল। ফ্রি রেডিক্যাল সম্পর্কে আমরা অনেকেই অবগত নই। আর তাই আজকের এই আর্টিকেলে আমরা এই নিরব ঘাতকটি কি কি শারীরিক ক্ষতি করে এবং এই ক্ষতিগুলোর সমাধান কি তা সম্পর্কে কিছু জানব।

ফ্রি রেডিক্যাল কি ? 

ফ্রি রেডিক্যাল হলো উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন এক প্রকার অণু। এটি আমাদের শরীরের কোষকলার ক্ষতি সাধন করে। ফ্রি রেডিক্যালসমূহ দেহে পরিপাক ও বিপাক ক্রিয়ার সময় প্রাকৃতিক ভাবেই উৎপন্ন হয় এবং স্বাভাবিক নিয়মে দেহ থেকে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে বের হয়ে যায়। কিন্তু এ অপসারণ প্রক্রিয়ার সময় কিছু ফ্রি রেডিক্যাল দেহের মধ্যে থেকে যায়। যা কোষের সাধারণ কার্যকলাপের ব্যাঘাত ঘটায়। মানুষের সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে দেহের কোষসমূহের জৈব ও রাসায়নিক কার্যকলাপের উপর। আর ফ্রি রেডিক্যাল হচ্ছে এক ধরনের পরমাণু যা বিজোড় সংখ্যক ইলেকট্রন বহন করে। দেহে একবার ফ্রি রেডিক্যাল উৎপন্ন হওয়ার পর তা যদি থেকে যায় তবে তা চেইনের মত একটির পর একটি বিক্রিয়া সংঘটিত করতে থাকে। এগুলো দেহ কোষের ডিএনএ ধ্বংস করে। কোষ মেমব্রেন নষ্ট করে এবং শেষ পর্যন্ত কোষকে মেরে ফেলে। এরা সর্বক্ষণ দেহে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করে। দেহে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা কালে কোষ প্রাচীরে অনবরত আঘাত হানতে থাকে। এর ফলে শরীরের মধ্যে আরও অধিক সংখ্যক ফ্রি রেডিক্যাল তৈরি হতে থাকে।

ফ্রি রেডিক্যাল কিভাবে শরীরের ক্ষতিসাধন করে ?

মানুষের দেহের কোষগুলোয় প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রকম অত্যাবশ্যক রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে। এসব বিক্রিয়ার কারণে ফ্রি রেডিক্যাল তৈরি হয় এবং তারা দেহে জমা হতে থাকে। সামান্য পরিমাণ ফ্রি রেডিক্যাল হয়তবা তেমন ক্ষতিকর নাও হতে পারে। তবে যখন বয়স বাড়ে এবং দেহে বেশি পরিমাণ ফ্রি রেডিক্যাল জমা হয়, তখন সেগুলো দেহ-কোষের ধ্বংস বা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মজার বিষয় হল দেহের যেসব কোষ যেমন- মুখের ভেতরের মিউকাস স্তরের কোষ ও পাকস্থলির আবরণী কোষ ইত্যাদি স্বল্প সময়ে প্রতিস্থাপিত হওয়ার সামর্থ্য রাখে তাদের বেলায় দেহে জনিত কোষ-মৃত্যু তেমন বড় কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

তবে যেসব কোষ যেমন – স্নায়ুকোষ, হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশি ইত্যাদি খুবই ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপিত হয় বা আদৌ প্রতিস্থাপিত হতে পারে না তাদের প্রতিটি কোষের মৃত্যুই ক্ষতির কারণ হয়। বেশি মাত্রায় এমন কোষের মৃত্যু বা ধ্বংস ঘটলে দেহে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে।

ফ্রি রেডিক্যাল শরীরের কি কি ক্ষতিসাধন করতে পারে ?

বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা মনের অজান্তেই ফ্রি রেডিক্যালজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছি। এর মধ্যে রয়েছে –

  • অতিরিক্ত পরিশ্রম
  • মানসিক চাপ
  • ধূমপান
  • জীবাণুর সংক্রমণ ও ইনফেকশন
  • বায়ু দূষণ
  • রেডিয়েশন (এক্স-রে), অতি বেগুনী রশ্মি
  • বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য, কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া
  • আধুনিক জীবন যাত্রার বিভিন্ন উপকরণ  

উপরোল্লিখিত কারণগুলোর ফলে দেহে ফ্রি রেডিক্যাল তৈরি হয়, যা দেহের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শরীরের মধ্যে ফ্রি রেডিক্যালের অবাধ বিচরণ দেহের স্বাভাবিক কাজকে বিঘ্নিত করে। ফ্রি রেডিক্যাল আমিষ, চর্বি ও নিউক্লিয়িক অ্যাসিডের সাথে বন্ধন তৈরি করে এবং অণুর গঠনের পরিবর্তন ঘটায়। যার ফলে দেখা দেয় নানা রকম শারীরিক সমস্যা। যেমন –

  • ক্যানসার
  • হৃদরোগ
  • বিভিন্ন চর্মরোগ
  • ত্বক কুঁচকে যাওয়া
  • ত্বকে বলি রেখা পড়া
  • ত্বক ঢিলা হয়ে যাওয়া
  • ত্বকের লাবণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়া
  • অ্যালজিমার ডিজিজ
  • পারকিনসন্স ডিজিজ
  • ডায়াবেটিস
  • আথ্রাইটিস
  • বিভিন্ন স্নায়ুবিক রোগ
  • মাল্টিকুলার ডিজেনারেশন
  • হাড়ের ক্ষয় রোগ
  • বাত-ব্যথা
  • বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যা ইত্যাদি।

্রি রেডিক্যালজনিত শারীরিক ক্ষতির সম্ভাব্য সমাধানঃ

বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে যেহেতু আমরা ফ্রি রেডিক্যালজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছি এবং সেই সাথে অকাল বার্ধক্য তথা বিভিন্ন রোগ-ব্যাধির কবলে পড়ছি, এ থেকে মুক্তির উপায় কি একেবারেই আমাদের হাতে নেই ? এ প্রশ্ন আপনার মনে জাগতেই পারে। এর উত্তর হলো, আছে। সুস্বাস্থ্য এবং যৌবন ধরে রাখা কঠিন কিছু নয়। শুধু মাত্র অসুস্থতা ও রোগ-ব্যাধি এড়িয়ে চললেই বার্ধক্যকে পরাস্ত করে তেজোদ্দীপ্ত যৌবন ধরে রাখা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, কিছু কিছু নিয়ম মেনে চললেই যৌবনকে দীর্ঘায়িত করা যায় এবং রোগ-ব্যাধিও দূরে থাকে। অপর দিকে অকাল বার্ধক্য দূর করার মূল হাতিয়ার হলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নামটি কি একটু চেনা চেনা মনে হচ্ছে? বর্তমানে, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নামটি দিন দিন অনেক বেশি পরিচিতি পাচ্ছে। ডাক্তার এবং ডায়েটিশিয়ানরা রোগীদের বিভিন্ন রোগের জন্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খেতে বলে থাকেন। এমনকি বাজারে পাওয়া প্রসেসড ফুড থেকে শুরু করে ত্বকের যত্নের বিভিন্ন ক্রিমেও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত করা হচ্ছে এবং বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। তাই চলুন দেখে নেই এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আসলে কি এবং ফ্রি রেডিক্যালকে সে কিভাবে পরাস্ত করতে পারে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কি ?

মানবদেহের জন্য অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সুস্থ জীবন যাপন ও অকাল বার্ধক্য রোধ করতে হলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সম্পর্কে জানা একান্ত প্রয়োজন। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এক ধরনের এনজাইম বা জৈব অণু যা আমাদের শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত রাসায়নিক বিক্রিয়া তথা জারন বিজারণ বিক্রিয়া থেকে বিরত রাখে, অত্যন্ত নিরাপদে কোষকে ফ্রি রেডিক্যালজনিত আঘাতের হাত থেকে সুরক্ষা করে এবং ফ্রি রেডিক্যালগুলোকে ধ্বংস করে। কারণ এগুলো অক্সিডেসন বিক্রিয়া দমন করে এবং যে কোন প্রকার ক্ষতি করা থেকে ফ্রি রেডিক্যালকে বিরত রাখে। আমাদের শরীরের মধ্যে কিছু কিছু এনজাইম রয়েছে যেমন- সুপার অক্সাইড ডিসমিউটেজ, গ্লুটাথিয়ন পারঅক্সাইড ইত্যাদি। এরা এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে নিত্য দিনের টেনশন, ধূমপান সবকিছুই আমাদের শরীরের নিজস্ব অ্যান্টিঅক্সিডেন্টকে ধ্বংস করতে থাকে। আর তাই ফ্রি রেডিক্যালের আঘাত থেকে রক্ষার জন্য দিন দিন অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কদর বেড়েই চলছে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উপকারিতাঃ

  • অকালে বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে।
  • কোষের ক্ষয়রোধ করে
  • উজ্জ্বল ত্বক প্রদান করে।
  • ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
  • রক্ত পরিশোধনে সাহায্য করে।
  • হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।
  • দৃষ্টি শক্তি ভালো রাখে।

এন্টিঅক্সিডেন্ট কিভাবে ফ্রি রেডিক্যালের আঘাত থেকে আমাদের রক্ষা করে?

ভিটামিন সি যুক্ত খাদ্য যেমন- আমলকি, পেয়ারা, আনারস, লেবু, কমলা লেবু, আমড়া ইত্যাদি টক জাতীয় ফল। পালং শাক, লাউ শাক, কুমড়া শাক, লাল শাক, ধনিয়া পাতা, পুদিনা পাতা, সজনে, ডাটা শাক, ঢেঁড়স, গাঁজর, মটরশুটি, নটেশাক, তরমুজ, টমেটো। ক্রিপটোজেনমিন যুক্ত খাদ্য যেমন- পাকা পেঁপে, পাকা আম, পাকা কুমড়া। লিউটিন যুক্ত খাদ্য যেমন- কালো জাম। ফাইটোইস্ট্রোজেন যুক্ত খাদ্য যেমন- সয়াবিন। এছাড়া রয়েছে বরবটি, সিম, মটরশুটি, কমলালেবু, আম জাম, কালো আঙ্গুর, ছোলা, গাজর, বিট, লেটুস, ঢেঁড়স, ক্যাপসিকাম ইত্যাদি। ভিটামিন ই যুক্ত খাদ্য ছোলা, বাদাম, সূর্যমুখীর তৈল ও বীজ, আটা বিভিন্ন রকম ডাল। কপারযুক্ত খাদ্য যেমন- নানা রকম শসা এবং চাল, ডাল, গম, শুকনো কিসমিস, শুকনো খেজুর, বাদাম ইত্যাদি। সিলোনিয়নযুক্ত খাদ্য হল পিঁয়াজ, রসুন, আদা। এগুলো সবই এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল যে, এই ভিটামিনগুলো এদের নিজেদের মধ্যে বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের নিজেদের ক্ষমতা বাড়িয়ে চলে। একটা উদাহরন দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। মনে করি ভিটামিন ‘এ’ একটি ইলেকট্রন দান করে একটি কনাকে স্থিতিস্থাপক করে। যার ফলে সে নিজে একটি ফ্রী রেডিক্যাল কণায় পরিনত হয়। এখন একটি ভিটামিন সি তাকে একটি ইলেকট্রন  দান করে  ভিটামিন “এ” এর ফ্রী রেডিক্যাল থেকে একটি পূর্ণ ভিটামিন “এ”- তে রূপান্তরিত করে। এভাবে চক্রাকারে অন্য সকল অ্যান্টি-অক্সিডেন্টগুলো এই পদ্ধতিতে যোগ দেয়। তার মানে এই পদ্ধতিতে বেশ কয়েকটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের দরকার হয়। তাই আলাদা করে কোন একটি বা দুটি ভিটামিন খেলে ঠিক ঠিক কাজ করে না। ভিটামিন সি অনেক গুরুত্বপূর্ণ পানিতে দ্রবীভূত হওয়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি কোষের বাহিরের ফ্লুইডে কাজ করে এবং কোষের লিপিডে ফ্রি রেডিক্যালের আক্রমনকে প্রশমিত করে। ভিটামিন ই হচ্ছে লিপিড বা ফ্যাটে দ্রবীভূত হওয়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি কোষের প্রাচীরের ফ্যাটি এসিডকে রক্ষা করে। ভিটামিন সি ভিটামিন ই কে রিজেনারেট করতে সাহায্য করে। বিটা ক্যারোটিন ভিটামিন ই এর সাথে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা খুব কম পরিমান ভিটামিন সি গ্রহন করে তাদের শুককীটের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই দেখা যাচ্ছে যে এই ফ্রী রেডিক্যাল কনাগুলো আমাদের বংশধারায়ও প্রভাব ফেলতে পারে। আর তাই এরকম দুরারোগ্য ব্যাধি, অকাল বার্ধক্য ও বংশগতির ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের প্রচুর পরিমানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গ্রহন করা উচিত।

Leave a Reply