You are currently viewing গর্ভকালীন টিকা সম্পর্কে কিছু কথা
গর্ভবতী মায়ের টিকা নেয়ার গুরুত্ব

গর্ভকালীন টিকা সম্পর্কে কিছু কথা

সুস্থ্ স্বাভাবিক সন্তান কে না চায়। আর তাই গর্ভকালীন সময়ে প্রতিটি মায়ের জন্য বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়। মহিলাদের গর্ভধারনের পূর্বেই নিজের স্বাস্থ্য, গর্ভধারণ ও সন্তান পালন সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার। কারণ একজন সুস্থ্ মা-ই পারে একটি সু্স্থ ও স্বাভাবিক শিশুর জন্ম দিতে। গর্ভকালীন যত্ন বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে বিশেষ ভাবে সাহায্য করতে পারে। আর যারা নতুন মা হতে চলছেন তাদের জানা প্রয়োজন যে গর্ভবতী মায়েদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট টিকা তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে। কারণ এই টিকাগুলো গর্ভবতী মায়েদের সম্ভাব্য ক্ষতিকর সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। শুধু মা নিজেই নন, গর্ভাবস্থায় টিকা নিলে তিনি নিজে এবং তাঁর আদরের সন্তান উভয়েই ক্ষতিকর সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবেন। এছাড়াও তাঁর সন্তানটি জন্মের কয়েকমাস পরেও তার নিজের টিকা শুরু করার আগ পর্যন্ত নিরাপদ থাকে। মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গর্ভের সন্তানকে গুরুতর অসুখ থেকে রক্ষা করে। আর তাই এই সময়ে গর্ভকালীন টিকা সম্পর্কে জানা প্রতিটি মা ও তাঁর পরিবারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই চলুন জেনে নেই কোন কোন টিকা গর্ভধারণের আগে গ্রহণ করতে হবে, কি কি টিকা গর্ভকালীন সময়ে গ্রহণ করতে হবে এবং এসময়ে কোন কোন টিকা নেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু তথ্য।

গর্ভবতী মায়ের টিকা নেয়ার গুরুত্বঃ

আমাদের দেশের গর্ভবতী মায়েরা তথা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য নিয়ে আসলেই কতটা সচেতন ? মায়ের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সবরকম খেয়াল রাখতে গিয়ে সবচেয়ে অবহেলা করেন নিজের প্রতি। অথচ গর্ভবতী মায়ের অসুস্থতা গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। যেমন গর্ভবতী মায়েদের রুবেলার ইনফেকশন হলে সন্তান জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে, এমনকি জন্মের পূর্বেও সন্তানের মৃত্যু হতে পারে। রুবেলা আক্রান্ত মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশুর এই ত্রুটি স্থায়ী। তাই পরবর্তী সময়ে শিশুটির দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। এছাড়া গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর সুরক্ষায় টিটেনাস টিকা নেওয়া আবশ্যক। ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুসারে এখনো সারা বিশ্ব প্রতি নয় মিনিটে একজন নবজাতক শিশু মারা যায় টিটেনাসের কারণে। তাই মা ও শিশুর সুরক্ষার জন্য গর্ভকালীন অবস্থায় ২৭ থকে ৩৬ সপ্তাহের মধ্যেই টিটেনাস টিকা দেওয়া উচিত। আবার কিছু রোগ আছে, যা মায়ের গর্ভ থেকেই শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। এইডস, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-এ এমন কিছু রোগ। বাংলাদেশে ৩ থকে ৫ শতাংশ গর্ভবতী মা হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বহন করেন, যা মা ও শিশুর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যানসারের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় ফ্লুর কারণে মা এবং গর্ভে বেড়ে ওঠা শিশু বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সম্মুখীন হয়।  সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে টিকা বা ভ্যাকসিনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অনেক সংক্রামক রোগই টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমাদের দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের টিকাদানের ব্যবস্থা আছে।

গর্ভবতী হওয়ার আগে কি কি টিকা নেয়া দরকার?

চিকিৎসকেরা বলেন, শুধু গর্ভবতী নয় সন্তান জন্মদানে সক্ষম এরকম প্রতিটি নারীর জন্যই নিয়মিত কিছু টিকা নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে টিকা এখন বেশ সহজলভ্য। বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি টিকাদান কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। একটি সরকার কর্তৃক পরিচালিত ইপিআই (Expanded Program on Immunization) এবং অন্যটি বেসরকারি। ইপিআই টিকা দান কর্মসূচীতে যেসব টিকা দেয়া হয় সেগুলো হলো –

  • বিসিজি – যক্ষার জন্য
  • ওপিভি – পোলিওর জন্য
  • পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা – ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হিমোফাইলাস বি ইনফ্লুয়েঞ্জা ও হেপাটাইটিস বি এর জন্য
  • পিসিভি – নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়ার জন্য
  • এম এম আর – মাম্পস, হাম ও রুবেলার জন্য
  • টিটি – ধনুষ্টংকারের জন্য

ইপিআই কর্মসূচীর উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী হচ্ছে ০ থেকে ১৮ মাস বয়সী সব শিশু এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী সন্তান ধারণক্ষম সব নারী। আগে সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রম পরিচালনায় সব ধরনের ভ্যাকসিন আমদানি করা হতো, কোনো ভ্যাকসিন উৎপাদন করা হতো না। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হতো, প্রয়োজনের সময় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যেত না এবং আমদানি করা ভ্যাকসিন সংরক্ষণে অসুবিধা হতো। আশার খবর হলো এখন দেশেই কিছু স্বনামধন্য ওষুধ কোম্পানি উন্নতমানের ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে, যা মানেও ভালো এবং দামও তুলনামুলকভাবে কম। তবে ইপিআই কর্মসূচীর মাধ্যমে সারা দেশে বিনা মূল্যে এ টিকাগুলো দেয়া হয়।

গর্ভবতী মায়ের রুবেলা ইনফেকশন হলে, সন্তান জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে, অথবা জন্মের পূর্বেই মৃত্যুবরন করতে পারে। মায়ের রুবেলার টিকা নেওয়া থাকলে গর্ভস্থ শিশু রুবেলাজনিত জন্ম ত্রুটি থেকে রক্ষা পায়। তাই গর্ভধারণের আগে রুবেলা টিকা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন, রুবেলার টিকা নেওয়ার কমপক্ষে এক মাস পর মা গর্ভধারণ করে। অর্থাৎ রুবেলার প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরে তৈরি হওয়ার পর গর্ভধারণ করতে হবে। তাই যেসব নারী গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন কিন্তু রুবেলার টিকা দেওয়া নেই, তারা গর্ভধারণের অন্তত এক মাস আগে টিকাটি দিয়ে নিলে সুরক্ষিত থাকবেন। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আমাদের দেশে সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারী যাদের বয়স ১৫ থকে ৪৯ বছর, তাদের জন্য ধনুষ্টংকার ও রুবেলার বিরুদ্ধে যথাক্রমে টিটি (যা বর্তমানে টিডি টিকা নামে পরিচিত) ও এমএমআর টিকা দেওয়া হয়। গর্ভবতী হওয়ার আগে মহিলাদের রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে নেয়া ভালো যে তার রুবেলা প্রতিরোধের ক্ষমতা আছে কি না। বর্তমানে আমাদের দেশে অধিকাংশ নারীকেই নয় মাস বয়সেই হামের সঙ্গে রুবেলার টিকার প্রথম ডোজ দেয়া হয় , আর দ্বিতীয় ডোজটি দেয়া হয় ১৫ বছর বয়সে। যদি কারো রুবেলা টিকা না নেওয়া থাকে, তাহলে দ্রুত টিকাটি নিয়ে নেয়া আবশ্যক।  হবু মায়েদের গর্ভধারণের আগেই টিটি টিকা নিতে হবে যেন বাচ্চার ধনুষ্টংকার না হয়। টিটি টিকার সিডিউল ও কোন ডোজ কখন দেবেন তা নিম্নে দেয়া হলোঃ

  • প্রথম ডোজ টিটি ও এমআর ১৫ বছর বয়স থেকে
  • দ্বিতীয় ডোজ টিটি প্রথম ডোজের ৪ সপ্তাহ পরে
  • তৃতীয় ডোজ টিটি দ্বিতীয় ডোজের ৬ মাস পরে
  • চতুর্থ ডোজ টিটি তৃতীয় ডোজের ১ বছর পরে
  • পঞ্চম ডোজ টিটি চতুর্থ ডোজের ১ বছর পরে

যদি আগে টিটেনাসের কোনো টিকা না নেওয়া থাকে, তবে সবগুলোই দিতে হবে।

গর্ভবতী হওয়ার পরে কি কি টিকা নেয়া দরকার ?

সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে টিকার ভূমিকা অনস্বীকার্য। অনেক সংক্রামক রোগই টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমাদের দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের টিকাদানের ব্যবস্থা আছে। গর্ভাবস্থায় সব ধরনের টিকা নিরাপদ নয়, আবশ্যক ও নয়। টিকা সাধারণত তিন ধরনের হয়। যেমন – জীবন্ত ভাইরাস, মৃত ভাইরাস এবং টক্সয়েড (ব্যাকটেরিয়া থেকে আহরিত রাসায়নিকভাবে পরিবর্তিত প্রোটিন, যা অক্ষতিকর)।

গর্ভাবস্থায় সাধারণত মৃত ভাইরাসের টিকা, যেমন – ফ্লু এর টিকা, টক্সয়েড টিকা যেমন – টিটেনাস, ডিপথেরিয়া ও পারটুসিস (Tdap) টিকা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

গর্ভাবস্থায় যেসব টিকা নেয়া নিরাপদঃ

  • ফ্লু (flu) এর টিকাঃ গর্ভাবস্থার মধ্যবর্তী সময়ে ফ্লুতে আক্রান্ত হলে তীব্র উপসর্গ বা নিউমোনিয়ার মত জটিল অবস্থার  সৃষ্টি করতে পারে। মাঝারি মানের ফ্লুতে আক্রান্ত হলেও জ্বর, মাথা ব্যথা, পেশীর ব্যথা, গলাব্যথা ও কাশির মত যন্ত্রণাদায়ক উপসর্গগুলো দেখা দেয়। সাধারণত ৪ দিনেই উপসর্গগুলো কমতে থাকে। তবে কাশি ও দুর্বলতা ২ সপ্তাহ বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে থাকতে পারে। আর তাই মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (CCD) ফ্লু (flu) এর ঋতুতে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মার্চের সময়টাতে যে সকল নারীরা গর্ভবতী হবেন তাদেরকে ফ্লু শট নেয়ার পরামর্শ দেয়। ফ্লু এর টিকা মৃত ভাইরাস দিয়ে তৈরি বলে মা ও গর্ভজাত সন্তান উভয়ের জন্যই নিরাপদ। কিন্তু ফ্লুমিস্ট একধরণের ন্যাজাল স্প্রে ভ্যাক্সিন যা জীবন্ত ভাইরাস দিয়ে তৈরি হয় বলে এটি গর্ভবতী নারীদের অবশ্যই এড়িয়ে যেতে হবে ।
  • টিটেনাস/ডিপথেরিয়া/পারটুসিস টিকা(Tdap)ঃ ধনুষ্টংকার বা টিটেনাস হল এমন একটি রোগ যার ফলে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয় এবং ঐচ্ছিক  পেশী তন্তুর দীর্ঘায়িত সংকোচন ঘটে ও বেদনাদায়ক খিঁচুনি হয়। টিটেনাস সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি মাটিতে এবং পশুর বর্জ্যে পাওয়া যায়। এই সংক্রমণ সাধারণত মানুষের শরীরের ত্বকের কোন স্থানে কেটে গেলে বা শরীরের কোথাও গভীর ও ময়লা ক্ষতের সৃষ্টি হলে এটি রক্তস্রোতে প্রবেশ করতে পারে। প্রসবকালে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতায় অসতর্কতা এবং অপরিষ্কার ছুরি, ব্লেড বা কাঁচি ব্যবহার করলে (বাচ্চার নাভী কাটার সময়) অথবা নাভীর গোড়ায় নোংরা কিছু লাগিয়ে দিলে নবজাতকের ধনুষ্টংকার রোগ হয়। এছাড়া গর্ভাবস্থায় টিটেনাসে আক্রান্ত হলে মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। গর্ভাবস্থায় টিটেনাস (ধনুষ্টংকার) থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য টিটি (TT) টিকা নিতে হয়। একে Tdap ও বলা হয়। গর্ভাবস্থার যে কোন সময়ই এটা নেয়া যায়। তবে গর্ভকালের ২৭-৩৬ মাসের মধ্যে নেয়াটাই উপযুক্ত সময়। এই টিকা টক্সয়েড ধরণের বলে গর্ভাবস্থায় নেয়ার জন্য নিরাপদ। শিশুদের যে পেন্টাভ্যালেন্ট (Pentavalent vaccines) টিকা দেয়া হয়, তাতে ধনুষ্টংকার প্রতিরোধী টিকা থাকে। কিন্তু এই টিকা নবজাতককে সুরক্ষা দিতে পারে না বিধায় সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচির আওতায় আমাদের দেশে সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারী যাদের বয়স ১৫ থকে ৪৯ বছর, তাদের জন্য ধনুষ্টংকারের বিরুদ্ধে টিটি টিকা দেয়া হয়। তবে টিটেনাসের ৫টি টিকার ডোজ সম্পন্ন থাকলে আর গর্ভাবস্থায় এই টিকা নেয়ার প্রয়োজন নেই। আর কেউ যদি কোনো টিকাই না নিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় ৫ম মাস থেকে ৮ম মাস এর মধ্যে ১ মাসের ব্যবধানে পর পর দুটি টিটি টিকা দিয়ে নিতে হবে। মধ্যে। কিন্তু শেষ ডোজ অবশ্যই প্রসবের ৪ সপ্তাহের আগে নিতে হবে। আর যদি পূর্বে দুই ডোজ টিকা নেয়া থাকে তাহলে প্রতি গর্ভাবস্থায় মাত্র একটি বুষ্টার ডোজ (booster dose) নিতে হবে। মাকে দেয়া এই টিকা মা ও বাচ্চা উভয়েরই ধনুষ্টংকার রোগের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। ডিপথেরিয়া শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণজনিত রোগ। এর ফলে শ্বাসকষ্ট হওয়া, প্যারালাইসিস হওয়া, কোমায় চলে যাওয়া এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আর পারটুসিস ব্যাকটেরিয়া ঘটিত চূড়ান্ত রকমের সংক্রামক রোগ। এর ফলে ক্রমাগত ও গভীর কাশি হয় এবং উচ্চ শব্দ হয় বলে একে ‘হুপিংকাশি’ ও বলে। টিটেনাস/ডিপথেরিয়া/পারটুসিস টিকা (Tdap) এই তিনটি রোগের বিরুদ্ধেই কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
  • হেপাটাইটিস বি এর টিকাঃ গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস বি এর টিকা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি কেউ স্বাস্থ্যকর্মী হয়ে থাকেন বা তার পরিবারের কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে এই টিকা নিয়ে নেয়া সবচেয়ে নিরাপদ। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস জনিত সংক্রামক রোগ। এর ফলে যকৃতের প্রদাহ, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি এবং জন্ডিস দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী লিভার ডিজিজ, লিভার ক্যান্সার এবং মৃত্যু ও হতে পারে। গর্ভবতী নারী যদি হেপাটাইটিস বি তে আক্রান্ত হন তাহলে প্রসবের সময় এই ইনফেকশন নবজাতকের মধ্যে ছড়াতে পারে। সঠিকভাবে চিকিৎসা করা না হলে শিশুর পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় মারাত্মক যকৃতের রোগ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। CCD এর মতে সকল গর্ভবতী নারীরই হেপাটাইটিস বি শনাক্তকরণের পরীক্ষা করানো উচিৎ। কারণ অনেক সময় এই রোগটি তার উপস্থিতির জানান দেয় না।

রিস্থিতি বিবেচনায় সেসব টিকা গর্ভাবস্থায় নেয়া যায়ঃ

  • হেপাটাইটিস এ এর টিকা হেপাটাইটিস এ এর টিকা যকৃতের এমন রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয় যা সাধারণত ছড়ায় সংক্রমিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে। জ্বর, ক্লান্তি ও বমি বমি ভাবের মত লক্ষণগুলো দেখা দেয় এই রোগে আক্রান্ত হলে। এটি হেপাটাইটিস বি এর সংক্রমণের মত মারাত্মক কোন রোগ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই অসুস্থতা গর্ভজাত সন্তানের উপর কোন প্রভাব ফেলে না। বিরল ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস এ প্রিম্যাচিউর লেবারের সৃষ্টি করতে পারে এবং নবজাতকের ইনফেকশনও হতে পারে। এই টিকা গর্ভাবস্থায় কতটুকু নিরাপদ তা এখনো জানা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, যেহেতু এটা মৃত ভাইরাস দিয়ে তৈরি সেহেতু গর্ভের সন্তানের উপর এর ঝুঁকির মাত্রা কম থাকবে। 
  • নিউমোকক্কাল ভ্যাক্সিনঃ কারো যদি দীর্ঘমেয়াদী কোন রোগ যেমন- ডায়াবেটিস অথবা কিডনি রোগ থাকে তাহলে চিকিৎসক গর্ভবতী মাকে নিউমোকক্কাল ভ্যাক্সিন নেয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যা কয়েক ধরণের নিউমোনিয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। এতে গর্ভজাত সন্তানের ক্ষতি কতটা হয় এই বিষয়টি এখনো অজানা, তবে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।

র্ভকালীন কি কি টিকা নেয়া যায় না?

গর্ভকালীন সময়ে জীবন্ত ভাইরাসের টিকা গ্রহণ করা উচিৎ নয়, কারণ এগুলো গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করতে পারে। । এ ধরনের টিকা গুলো হল মাম্পস, হাম, রুবেলার (MMR) টিকা, ভ্যারিসেলা (চিকেন পক্স), বিসিজি, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস এবং ইয়েলো ফিভারের টিকা। এছাড়াও টাইফয়েড এবং জাপানিজ এনকেফালাইটিসের টিকাও পরিহার করা ভালো। তবে ডায়াবেটিস বা হাঁপানি ইত্যাদির উপরও টিকাগুলো নেয়া না নেয়া নির্ভর করে। তাই ডাক্তার ও টিকা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক টিকা গ্রহণ করতে হবে।

ভ্রমনকালীন টিকাঃ

গর্ভবতী অবস্থায় যদি মাকে কোন ভ্রমণে যেতে হয়, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ নিয়ে ভ্রমনকালীন টিকা নেয়া যেতে পারে। গর্ভবতীকালীন ভ্রমণের সময়ে যেসব টিকা নেয়া হয়, সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে র‍্যাবিস ও মেনিনজাইটিসের টিকা।

পরিশেষে একটা কথা না বললেই নয় আর তা হচ্ছে, আপনি কখন সন্তান গ্রহণের পরিকল্পনা করবেন সেটা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করুন। আপনার সব ধরনের শারীরিক পরীক্ষা করিয়ে দেখে নিন আপনার শরীর সেই মূহূর্তে সন্তান ধারণ করার মত অবস্থায় আছে কিনা। কখন সন্তান ধারণ করলে মা ও শিশুর জন্য নিরাপদ হবে সেটা জেনে নিন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে। আর আপনি নিজে গর্ভবতী হলে বা আপনার পরিবার ও বন্ধুদের কেউ গর্ভবতী হলে এই টিকাগুলো সময়মতো যাতে নেয়া হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। এর ফলে অনাগত শিশু ও মা উভয়েই নিরাপদ থাকবেন। যেকোন ভ্যাক্সিন নেবার আগে অবশ্যই আপনার গাইনি ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিন এবং ভবিষ্যতে যাতে ট্র্যাক করা যায় এজন্য কবে কী ভ্যাক্সিন দিচ্ছেন তার চার্ট সংরক্ষণ করুন। গর্ভ এবং প্রসবকালীন উপযুক্ত সেবা প্রদানের মাধ্যমে একটি সুস্থ মা এবং সুস্থ শিশুর জন্ম নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

Leave a Reply