You are currently viewing করোনাভাইরাস কি: এর লক্ষণ ও প্রতিকার
করোনাভাইরাস কি: এর লক্ষণ ও প্রতিকার

করোনাভাইরাস কি: এর লক্ষণ ও প্রতিকার

করোনাভাইরাস কি?

করোনাভাইরাস বা COVID-19 হ’ল একটি সংক্রামক রোগ। এটি এমন একটি সংক্রামক ভাইরাস যা মানুষের মধ্যে আগে কখনো সনাক্ত হয়নি।

এই ভাইরাসের কারণে কাশি, জ্বর এবং আরও মারাত্মক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া জাতীয় লক্ষণগুলির সাথে শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতা (ফ্লুর মতো) হয়ে থাকে। করোনাভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট রোগকে COVID-19 বলে।

এর আরেক নাম ২০১৯-এনসিওভি বা নভেল করোনাভাইরাস। এটি এক ধরণের করোনাভাইরাস। করোনাভাইরাসের অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ছয়টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। তবে নতুন ধরণের ভাইরাসের কারণে সেই সংখ্যা এখন থেকে হবে সাতটি। 

২০০২ সাল থেকে চীনে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া সার্স (পুরো নাম সিভিয়ার এ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামে যে ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৭৭৪জনের মৃত্যু হয়েছিল আর ৮০৯৮জন সংক্রমিত হয়েছিল। সেটিও ছিল এক ধরণের করোনাভাইরাস।

COVID-19 রোগটিকে প্রথমদিকে বিভিন্ন নামে ডাকা হচ্ছিল, যেমন: ‘চায়না ভাইরাস’, ‘২০১৯ এনকভ’, ‘নতুন ভাইরাস’, ‘করোনাভাইরাস’, ‘রহস্য ভাইরাস’ ইত্যাদি।

২০২০ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(WHO) নতুন এই রোগটির আনুষ্ঠানিক নাম দেয় কোভিড-১৯ যা ‘করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

উৎপত্তি

চীনের উবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে সর্বপ্রথম এই রোগের সূচনা।

করোনা ভাইরাসের খবর প্রথম জানিয়েছিলেন করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল উহানের কেন্দ্রীয় হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ লি ওয়েনলিয়াং নামের ৩৩ বছর বয়সি এক চিকিৎসক। ডা. লি গ্রুপ চ্যাটে সহকর্মী চিকিৎসকদের ভাইরাসটি নিয়ে সতর্ক করে সংক্রমণ এড়াতে ‘প্রতিরক্ষামূলক পোশাক’ পরার পরামর্শ দেন। তবে তখনও তিনি জানতেন না, যে রোগটি ধরা পড়েছে সেটি করোনা ভাইরাস। সতর্ক বার্তা লেখার চারদিন পর পুলিশ তার সঙ্গে দেখা করে এবং একটি মুচলেকায় তার স্বাক্ষর নেয়। যেখানে তার বিরুদ্ধে ‘সামাজিক শৃঙ্খলায় মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ‘মিথ্যা মন্তব্য’ করার অভিযোগ আনা হয়। মুচলেকায় লেখা ছিল, ‘আমরা আপনাকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিচ্ছি, আপনি যদি জেদ ধরে এমন অবৈধ কার্যকলাপ চালিয়ে যান, তাহলে আপনাকে বিচারের আওতায় আনা হবে।’ চিনা কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি যার কারণে ভাইরাসটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পরে। অনেক মানুষের মৃত্যু হলে নায়কোচিত প্রশংসা পান ডা. লি। তবে শেষ রক্ষা হয়নি এই ডাক্তারেরও। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েই ৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২০ মারা যান ড. লি।

৩১শে ডিসেম্বর উহান শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে চীনের কর্তৃপক্ষ প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে(WHO) সতর্ক করে। এর পর ১১ই জানুয়ারি প্রথম এই রোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়।

কোন প্রাণী থেকে ছড়িয়েছে?

ধারণা করা হয় যে,  এই ভাইরাসটি বাদুর বা সাপ থেকে মানুষের দেহে ঢুকেছে, তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে।

উহানে একটি বাজার রয়েছে যেখানে অবৈধ বন্যপ্রাণী বেচাকেনা হয়। উহানের এই বাজারে জ্যান্ত মুরগি, বাদুড়, খরগোশ, এবং সাপ বিক্রি হয়। হয়তো, এগুলোর কোন একটি থেকে করোনাভাইরাস নামক মরণঘাতি ভাইরাস মানুষের দেহে ছড়িয়েছে।

COVID-19 কিভাবে ছড়ায়?

ভাইরাসটি প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ঢুকেছে এবং একজন থেকে আরেকজনের দেহে ছড়াতে ছড়াতে আবার নিজের জিনগত গঠনে সবসময় পরিবর্তন আনছে, যাকে মিউটেশন বলে। ভাইরাসটি মানুষের দেহকোষের ভেতরে ‘মিউটেট করছে’ অর্থাৎ গঠন পরিবর্তন করে নতুন রূপ নিচ্ছে এবং সংখ্যাবৃদ্ধি করছে যার ফলে এই ভাইরাসটি অনেক বেশি বিপজ্জনক।

করোনাভাইরাসের নতুন প্রজাতি কোভিড-১৯ অন্যান্য ভাইরাসের তুলনায় একটু বড়, সাধারণত ৫ মাইক্রোনের বেশি। তাই ৩ ফিট বা ১ মিটারের বেশি বাতাসে ভাসতে পারেনা।

আক্রান্ত ব্যক্তির হাচি কাশির মাধ্যমে এ ভাইরাসের জীবাণু বাস, ট্রেন, আসবাবপত্র বা অন্য কোথাও গিয়ে পরে। তাপমাত্রাভেদে এ জীবানু ২৪ বা ৪৮ ঘন্টার বেশি বাঁচতে পারেনা। একজন স্ববাভাবিক ব্যক্তি গড়ে মিনিটে একবার চোখে, মুখে নাকে হাত দেয় তখন শরীরের কোষের সাথে মিশে কোটি কোটি জীবাণু তৈরি করে তারপর রক্তে মিশে যায়। প্রথমেই এ ভাইরাস মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় যার ফলে সর্দি কাশি দেখা দেয় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে এটি একজনের দেহ থেকে আরেক জনের দেহে ছড়ায়। সাধারণ ফ্লু বা ঠান্ডা লাগা যেমন হাঁচি-কাশির মতো করেই এ ভাইরাসের লক্ষণ। যারা ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগে আক্রান্ত তাদের বেশি কাবু করে। মারাত্মক পর্যায়ে এ ভাইরাস নিউমোনিয়ার মত রোগ সৃষ্টি করে ফলে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকার্যকর হয়ে পরে।

কিভাবে ছড়ায়?

  • মূলত বাতাসের মাধ্যমে
  • আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে
  • আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে
  • পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে ছড়াতে পারে
  • ভাইরাস আছে এমন কোন জিনিস স্পর্শ করে হাত না ধুয়ে সে হাত নাকে,মুখে,চোখে লাগালে এ ভাইরাস ছড়ায়।
  • গবাদি পশু পাখির মাধ্যমে ছড়াতে পারে

লক্ষণসমূহ কি কি?

  • সর্দি
  • কাশি
  • জ্বর
  • শ্বাসকষ্ট 
  • মাথাব্যথা
  • গলাব্যথা
  • পেশিতে ব্যথা
  • মারাত্মক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
  • শিশু, বৃদ্ধ ও কম রোগ প্রতিরোধ সম্পন্ন লোকের নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিস হওয়া।

চিকিৎসকরা বলেছেন,  করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার পর সাধারণ জ্বর এবং শুকনো কাশি শুরু হয় এবং একই সাথে মাথা ব্যথা ও পেশিতে ব্যথা হতে পারে। আক্রান্ত হবার দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরুর সম্ভাবনা থাকে। 

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলেই করোনাভাইরাস হয়েছে তা নয়, কারণ সাধারণ ঠান্ডা লাগা বা ফ্লুতে এমন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে সতর্কতার সাথে চিকিৎসা নিতে হবে,  করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে এসব লক্ষণ দেখা দিবে এবং লক্ষণগুলো তীব্র থেকে তীব্রতর হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, সংক্রমণের ১৪ দিনের মধ্যে রোগীর শরীরে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ দেখা যাবে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, সংক্রমণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও লক্ষণ দেখা যেতে পারে।

সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও পরিচর্যা না করলে সংক্রমণের তীব্রতায় নিউমোনিয়া, শ্বাসযন্ত্রে প্রদাহ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অচল হয়ে যাওয়ার পর রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

লক্ষণ দেখা দিলে প্রচুর পানি, ফলের রস পান করতে হবে এবং নিকটস্থ হাসপাতালে যেতে হবে।

কিভাবে প্রতিরোধ করব?

করোনাভাইরাসের কোন প্রতিষেধক ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি তাই চিকিৎসকরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন।

তাই সতর্কতাই এ ভাইরাসেরর সংক্রামণ থেকে রক্ষা পাবার একমাত্র উপায়

  • হাত না ধুয়ে মুখ, চোখ, নাক স্পর্শ না করা
  • ঘরের বাইরে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে
  • গণজমায়েত এড়িয়ে চলুন
  • চলাচল সীমিত করতে হবে
  • চুমা খাওয়া, কোলাকুলি করা, কাধে হাত চাপড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে
  • হাঁচি কাশি দেয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখা অর্থাৎ হাঁচি কাশি দেয়ার সময় মুখের সামনে টিস্যু পেপার ধরতে হবে যাতে এই ভাইরাস অন্যকে আক্রান্ত না করে। হাঁচি দেয়ার পরে টিস্যু পেপারটি মুড়িয়ে নিরাপদ স্থানে ফেলতে হবে যাতে ভাইরাসটি ছড়াতে না পারে কারণ তাপমাত্র ভেদে ভাইরাসটির জীবাণু ২৪ বা ৪৮ ঘন্টার বেশি বাঁচতে পারেনা।
  • বাসায় ফিরে ময়লা কাপড় ধুয়ে ফেলুন
  • ঠান্ডা বা ফ্লু আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে না মেশা
  • মাছ, মাংস, ডিম ভালভাবে সিদ্ধ করে রান্না করা
  • মাঝে মাঝে সাবান পানি বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুতে হবে
  • বন্য জীবজন্তুু খালি হাতে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে
  • স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পড়ে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে হবে।

কোনসময় হাত ধুতে হবে

  • হাঁচি কাশি দেয়ার পর
  • রোগীর শুশ্রুষা করার পর
  • জীবাণু লেগে থাকতে পারে এমন কিছু স্পর্শ করার পর
  • খাবার প্রস্তুত এবং খাবার খাওয়ার আগে ও পরে
  • যখনই হাত ময়লা হবে
  • টয়লেট করার পর
  • পশুপাখি এবং পশুপাখির মল স্পর্শ করার পর

Arif Billah

স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য, উপাত্ত এবং পরামর্শ নিয়ে আমি সবসময় হাজির আছি আপনার পাশে!

This Post Has One Comment

Leave a Reply